অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। একেবারেই সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত এ দেশপ্রেমিক শিক্ষক-মানুষটির জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬ সালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক।
আশির দশকে বিশ্বব্যাপি সম্পদ লুণ্ঠনের বিষয়ে নিজের কলাম লেখা শুরু করেন। এরপর ৯০ এর দশকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে আগ্রাসী ছোবল দিলে দৃষ্টি দেন বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষার বিষয়ে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী শোষণ, বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ রক্ষার আন্দোলনসহ যে কোন প্রকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন সচেতন এই মানুষটি। কয়েকদিন আগে এক সন্ধ্যায় তার সঙ্গে কথা হয় মালিবাগে স্যারের বাসার চতুর্থ তলায়।
বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ, এ বিষয়ে জনগণের সচেতনতা, জাতীয় সম্পদ রক্ষার বিষয়ে মধ্যবিত্ত, ভদ্রসমাজের ভাবনা, জাতীয় কমিটির কার্যক্রম, এর ভবিষ্যৎ, ব্যবসায়ীদের দায়িত্ববোধ, সচেতনতা, রাজনৈতিকদলগুলোর চরিত্র, বাম আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে তার সম্পৃক্ততা, এদেশের বিভিন্ন পেশার বেশ কয়েকজন বিদেশি কোম্পানির তল্পিবাহকের নির্লজ্জ দালালি, নিজের দায়বোধ, জাতীয় সম্পদ নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা, বিভিন্ন সময় সরকারি-বেসরকারি উগ্রপ্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠির দ্বারা আক্রমণসহ বিভিন্ন বিষয়ে একেবারেই সরস বয়ন রেখেছেন এই কথোপকথনে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উন্মোচনডটকমের স্টাফ রিপোর্টার সালমান তারেক শাকিল। আজ প্রকাশ করা হল কথোপকথনের দ্বিতীয় পর্ব-
প্রথম পর্বের পর
উন্মোচনডটকম: কিন্তু এতে জনগণ কতটা সচেতন, বড় দলগুলোর দেশের এ বিরোধীতা কী জনগণ বুঝতে সক্ষম?
আনু মুহাম্মদ: তারা বিভিন্নভাবে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও জনগণকে ঠেকাতে পারে না। জনগণের বড় একটা অংশ, যারা আওয়ামী লীগ করে, বিএনপি করে, তারার যদি নিজেদের অধিকার বুঝতে পারে, তাদের স্বার্থটা বুঝতে পারে, তাহলে দেখা যাবে, তাদের দলত্যাগ করে জাতীয় কমিটির আন্দোলনে যোগ দিবেন।
ফুলবাড়ি গণঅভুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সত্যতা প্রমানিত হয়েছে। দেখা গেছে সেখানকার তৎকালীন এমপি বর্তমানে মন্ত্রী তিনি ছাড়া আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ি আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে।
বিএনপি তখন ক্ষমতাসীন থাকলেও তাদের নেতারা হয়তো আন্দোলনের বিরোধীতা করেছেন, কিন্তু তাদের অনেক নেতা-কর্মী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
আসলে যখন জাতীয় কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে তাদের দাবি জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন, তখন কেবল কয়েকটি বাম দল বা বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এমন নয়, বিশাল জনগোষ্ঠিও এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাস্তায় নেমে এসেছেন।
তার মানে, আমাদের আন্দোলনের শক্তি কিন্তু এটাই। আমাদের আন্দোলনের শরিক অনেকগুলো রাজনৈতিক দল আছে, তাদের সম্মিলিত শক্তির চাইতে এই আন্দোলনের সমর্থন ভিত্তিটা আরো অনেক দূর বিস্মৃত। জনগণের মধ্যে একটা ব্যাপক অংশ এই আন্দোলনের সমর্থক।
তাদের সমর্থনের উপরে এই আন্দোলনের বিকাশের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যেও রাজনৈতিক চেতনার কিংবা তাদের স্বার্থ চেতনার একটা বিকাশ হচ্ছে, যেটা স্পষ্ঠতই বুঝা যায়।
উন্মোচনডটকম: ফুলবাড়িতে গণঅভুত্থানের পর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সঙ্গে ফুলবাড়ির জনগণের ছয় দফা চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির ফলাফল কতদূর?
আনু মুহাম্মদ: পুরো চুক্তি তো বাস্তবায়ন হয় নি। কিছু কিছু অংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকার ঘটনায় নিহত-আহত এবং ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা দিয়েছে। নেতা-কর্মীদের নামে মামলা প্রত্যাহার করেছে। শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের জন্য বরাদ্ধ রেখেছে আলাদা করে।
কিন্তু সারা দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি না করার চুক্তি ছিল, এটি বাস্তবায়ন করে নি। এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়ন করার চুক্তি ছিল।
তারপর কোথাও কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের আগে সংশ্লিষ্ঠ অঞ্চলের মানুষের সম্মতি গ্রহন করতে হবে।-এই বিষয়গুলি সরকার বাস্তবায়ন করেনি। মানুষের উপর গুলিবর্ষণের তদন্ত এখনো অন্ধকারে।
ফলে সরকারের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে আইনগত দিক যদি দেখা হয়, জনগণের সঙ্গে যদি সরকারের কোন চুক্তি হয়। আর সেই চুক্তির কোন না কোন অংশ যদি সরকার বাস্তবায়ন করে, তাহলে পুরো চুক্তিটাই বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। কারণ এটা সরকার ভ্যালুয়েড ডকুমেন্ট হিসেবে নেয়।
উন্মোচনডটকম: কিন্তু তখন তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুলবাড়ির চুক্তির বাস্তবায়নের কথা দিয়েছিলেন?
আনু মুহাম্মদ: হ্যা, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে গিয়েছিলেন। ফুলবাড়িতে গিয়ে তিনি পুরো আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে আন্দোলনকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ফুলবাড়ি চুক্তি অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। ফুলবাড়ি চুক্তি যদি সরকার বাস্তবায়ন না করে, এর পরিনতি ভয়াবহ হবে।
মজার বিষয় চারদলের সরকার চুক্তি করল, আওয়ামীলীগ চুক্তি সমর্থন করল, তার মানে এই চুক্তি নিয়ে তো আর প্রশ্ন নাই। চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।
দেখা যাচ্ছে, এই সরকার আসার সাড়ে তিন বছর হল, এখন পর্যন্ত এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন তারা করে নাই। বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি, এশিয়া এনার্জি লন্ডনে এখনো ফুলবাড়ি কয়লা খনির নামে শেয়ার ব্যবসা করে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে। বিষয়টি আমরা সকল সরকারকে বলছি, যে এটা অন্যায়, অবৈধ।
কিন্তু কোন সরকারই এশিয়া এনার্জির এই চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করেন নি। একটা দেশে সরকার থাকা অবস্থায় কী করে বাংলাদেশের সম্পদ দেখিয়ে একটা বিদেশি কোম্পানি বিদেশে শেয়ার ব্যবসা করে? এটা কী করে হয়। চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটে, কিন্তু মিডিয়াতেও ঘটনাটা খবর হিসেবে আসে না। আমরা জাতীয় কমিটির অনেকবার সাংবাদিক সম্মেলনে বিষয়টি তুলে ধরছি, কিন্তু কেউ-ই বিষয়টি নিয়ে লিখেন না। মিডিয়া এই দিকটাই আসতেই চায় না।
উন্মোচনডটকম: কেন, মিডিয়ার এই আচরণ?
আনু মুহাম্মদ: আমি জানি না কী কারণে তারা এটা খবরে আনতে চায় না। এটার সঙ্গে মিডিয়ার কোন কর্তাব্যাক্তির যোগাযোগ আছে কী না। কিন্তু এশিয়া এনার্জি লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করছে, এবং সেখান থেকে তারা মুনাফাও অর্জন করছে। সেই মুনাফার কিছু কিছু অংশ তারা বাংলাদেশে বিতরণ করে।
উন্মোচনডটকম: বেশ কিছুদিন আগের এরকম শোনা গিয়েছিল বেশ কয়েকজন সাংবাদিকদের তারা বিদেশ সফর করিয়ে এনেছেন?
আনু মুহাম্মদ: হ্যা, এরকম খবর শুনেছি, তারা অনেককে জার্মান সফরে নিয়ে যায়। কিছু কিছু সাংবাদিকদের তারা বিদেশ ঘুরিয়ে নিয়ে আসে।
এখানে এনার্জিয়ান পাওয়ার নামে একটা পত্রিকা আছে, মোল্লা আমজাদ সম্পাদিত এশিয়া এনার্জি তাদের দুপাতা করে বিজ্ঞাপন দেয়। এখানে দুপৃষ্ঠার করে বিজ্ঞাপন দেওয়ার অর্থ তো বুঝাই যায়।
তারপরে আমরা শুনতে পারছি, বাংলাদেশের একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থাও এশিয়া এনার্জির মিডিয়া পার্টনার হিসেবে কাজ করছে। এই সংস্থাটি দায়িত্ব নিয়ে তাদের পক্ষে প্রচারণার কাজ করবে।
তার মানে কিছু সংখ্যক কনসালটেন্ট নামের লোক এই কাজ করছে। এ কাজে কেউ কেউ বিশেষজ্ঞ’র ভূমিকা পালন করছেন। কিছুদিন আগে ভারত থেকে এক ভদ্রলোককে ভাড়া করে আনা হয়েছিল। সেই ভাড়া করা লোক কী রকম- কোন বিশেষজ্ঞকে যদি ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়, তাহলে তার কত অধঃপতন হয় এটা বুঝা যায় এই ঘটনায়।
কিছুদিন আগে কানাডা তার নিজের দেশের সীমান্তে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে পাহাড়ের উপর কয়লা খনি করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে বাঁধা দেয়।
কারণ, কানাডার এই মনটানা সীমান্তের ২৫ মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের যে লেক আছে, বন আছে, পার্ক আছে, সেটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, সে কারণে যুক্তরাষ্ট্র সেটা করতে দেয়নি কানাডাকে।
তো ভারত থেকে ভাড়া আনা সেই বিশেষজ্ঞ কিছুদিন আগে বলেছেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি করলে পানি আরও ভাল হবে। এবং আবাদ আরও ভাল হবে। উর্বরতা ভাল হবে। এই বিশেষজ্ঞ অজয় ঘোষকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো উচিৎ (বলে হাসেন আনু মুহাম্মদ।) কানাডা এই বিশেষজ্ঞকে কেন ভাড়া করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায় না যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝানোর জন্য?
উন্মোচনডটকম: এতে বাংলাদেশের জন্য কী হুমকি হতে পারে?
আনু মুহাম্মদ: এরকম লোকতো এশিয়া এনার্জি দেশের ভেতর সরকারের ভেতর অনেক লোক তৈরি করেছে, যারা কিছু টাকার বিনিময়ে দেশের সর্বনাশ করতে প্রস্তুত। তাদের গা কাঁপেনা। এধরনের লোক এই বিদেশি কোম্পানি গুলো তেরি করেছে।
কিন্তু এতে কোন লাভ হবে না। দেশের মানুষের মধ্যে জাতীয় সম্পদের বিষয়ে যে সজাগ ভাব দেখি কিংবা ফুলবাড়ি সহ সেখানে ৬ থানার মানুষের মধ্যে উন্মুক্ত পদ্ধতি নিয়ে এমন জানাশোনা তাতে দেশের বিরোধীদের কোন সুযোগ হবে না সম্পদ পাঁচারের।
আমাদের সাম্প্রতিক আান্দোলনে বিষয়টি প্রমানিত হয়েছে।
সুতরাং যারা মনে করে ভয় দেখিয়ে, টাকার লোভ দেখিয়ে, কিছু দালাল তৈরি করে সম্পদ পাচার করা যাবে, তাতে কোন লাভ হবে না।
উন্মোচনডটকম: আপনি বলছিলেন এদেশের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়া এনার্জির প্রচারণার কাজে লিপ্ত, এটা কোন সংস্থা?
আনু মুহাম্মদ: আমি বিজ্ঞাপনী সংস্থার নাম জানি না, তবে যতদূর জানি এটার সঙ্গে আলী যাকেরের সম্পৃক্ততা আছে।
ক্রমশ
আগের পর্ব: জাতীয় কমিটির আন্দোলন দুর্বৃত্ত বিশ্বজোটের বিরুদ্ধে: আনু মুহাম্মদ
লিংক: http://www.unmochon.com/2012/08/26/19390.html#.UD9MjMEgcqM



