কুলদা রায়•
আশুলিয়ায় দেবনায়ার গারমেন্ট কারখানায় আগুন লাগিয়েছে একজন শ্রমিক। তিনি একজন মহিলা।
এই আগুন লাগানোর জন্য নিয়েছেন মাত্র ২০ হাজার টাকা। আগুন লাগাতে দেখেছেন আরেকজন শ্রমিক। তিনি চিৎকার দিয়ে উঠেছিলেন আগুন আগুন বলে। ততক্ষণে আগুন লেগেছে। আগুন নেভানো হয়েছে। নিভিয়েছে শ্রমিকরাই। পুলিশ ম্যাচকাঠি দিয়ে আগুন ধরানোর দায়ে সুমিকে আটক করেছে।
“সুমী জানিয়েছেন, আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য জাকির তাকে ২০ হাজার টাকা দেয়ার প্রলোভন দেখায়। যদি সে এ কাজ না করত, তাহলে তার স্বামীকেও মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়।” জাকির আরেকজন শ্রমিক। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “গতকালকে (দেবনায়ার) যে ঘটনাটা ঘটেছে। একজন মহিলা শ্রমিক ভেতরে গিয়ে আগুন দেয়। সে আগুন দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন মহিলা শ্রমিক সেখানে গিয়ে চিৎকার দেয়। আগুন নেভায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে।
“আমি সিসি ক্যামেরার ওই ছবি দেখে এসেছি। একজন মহিলা ঘরে ঢুকল এবং আগুন দিয়ে বের হয়ে এল।
এর আগে আশুলিয়ায় তাজরিন গারমেন্টসে আগুন লেগেছে। সেখানে ১২০ জন শ্রমিক মারা গেছে। হয়তো আরো মারা গেছে। তাদের হিসেবটা বলা হচ্ছে না। বলা হলেই তাদেরকেও এক লাখ টাকা আর গরু-ছাগল-হাস-মুরগীর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। বলা হবে, তোমরা আরেকটু মোটাতাজা হও। আরো কিছু পোলা-মাইয়ার পয়দা দাও। সবাই আবার গারমেন্টসে কাজ করতি আসিও। আমাগো ট্যাকা-পয়সা কামাই করার সুযোগ দিও আরো বেশি করে। তার বিনিময়ে আবার ২০ হাজার টাকা দিয়ে আগুন লাগিয়ে তোমাগো পোড়ানো হইবে। এটা টাকা টাকা খেলা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই ২০ হাজার টাকায় আগুন লাগানোর কাহিনীটা সংসদে বলেছেন। বুঝতে কষ্ট হয় না যে তিনি বলার চেষ্টা করেছেন তাজরিনেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও ২০ হাজার টাকার কাহিনী না হয়ে যায় না। এই কাহিনী আসায় সরকারের ক্রেডিবিলিটি বেড়ে গেল। তারা এখন রিলাক্স মুডে আছেন। কারণ–
১) শ্রমিকরা নিজেরাই আগুন লাগিয়ে মেরেছে শ্রমিকদের। মালিককে মারেনি। শ্রমিকরাই খারাপ। এই খারাপ শ্রমিকদের জন্য বেশি কিছু করা ঠিক না। এই পিপিলিকাদের পাখা হয় মরিবার তরে। ফলে সরকারের সাত খুন মাফ।
২) মালিকপক্ষ খুব ভালো। তারা মানুষকে চাকরি দেয়। তাদেরকে মারে না। সুতরাং মালিকদের কোনো শাস্তির দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো মানে নেই। তাদেরকে সিআইপি করা হোক। এমপি-মিনিস্টার করা হোক। আবুল গোষ্ঠী বাড়ানো হোক। প্রকৃত আবুল ছাড়া সরকার চলে না।
৩) এই ২০ হাজার টাকা কে বা কারা দিয়েছে এটা আবিষ্কার করার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে আবিষ্কার হবেই। বলা হবে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যে এটা বিরোধীরা করছে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলা হবে এটা বিএনপিরা করেছে। এটা জামায়াতে ইসলামী করেছে।
করতে পারে। অস্বাভাবিক নয়। বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে এসব কাণ্ড ঘটাতেই পারে। আর জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম-নিজামী-কাদের-সাঈদীকে বাঁচানোর জন্য, তাদের রাজনীতিটা ঠিক রাখার জন্য এখন গারমেন্টসে আগুন দেবে। ট্রেনে আগুন দেবে। সিনেমা হলে বোমা মারবে। চার্চে আগুন দেবে। বৌদ্ধপল্লীতে আগুন দিয়েছে। হিন্দুদের মেরেছে। পাহাড়ে আগুন দিয়েছে। ছাত্রদের রগ কেটে দিচ্ছে। আরো ভয়ংকর কিছু করবে। এটা জানা কথা। কিন্তু সরকার তুমি কী করছ? কী করবে? লবেঞ্চুস মুখে দিয়ে লিদ্রা যাবে? সরকার, তোমাকে পোষা হচ্ছে কেনো? তোমার কাজই তো এই, যে—যাতে এই ধরনের নাশকতা কেউ না করতে পারে তার ব্যবস্থা নেওয়া।
একজন নাগরিকের কাজ দরকার। সে কাজ যোগাড় করে দেবে সরকার। তার সংসার চলার মতো বেতন যোগাড় করে দেবে সরকার। সেই বেতন নিয়ে যাতে সেই নাগরিকটি একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই বাসা ভাড়া করতে পারে বা কিনতে পারে, বাজার থেকে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম কিনতে পারে সে ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকারের। নাগরিকটি যাতে একটি বিয়ে করতে পারে, ছেলে মেয়ের জনক বা জননী হতে পারে তা নিশ্চিত করবে সরকার। তাদের স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বিকাশের সকল সুযোগ-সুবিধা চাহিবার আগেই সরকার যোগান দেবে। এই নাগরিকটি যাতে তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপদে কাজ করে ঘরে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থাও করবে সরকার।
আর কর্ম ক্ষেত্রে কর্মের উপযুক্ত পরিবেশ থাকতে হবে। থাকতে হবে নিরাপত্তার ফলপ্রসূ ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের টুলসগুলো সেখানে থাকবে। সেগুলো কার্যকর থাকবে। সেগুলো পরিচালনা করার জন্য প্রশিক্ষিত ফায়ার গার্ড থাকবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক সিকুইরিটি অফিসার থাকবে। থাকবে এমারজেন্সি সেফটি দরজা। সেখানে সদাসর্বদা সিকুইরিটি নিয়োজিত থাকবে। এই দরজাগুলিতে এমন এমারজেন্সি তালা থাকবে যা ঠেলা দিলেই খুলে যাবে। চাবির দরকার হবে না। বাইরে থাকবে অসংখ্য সেফটি সিঁড়ি। এই পুরো পদ্ধতিগুলি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের আওতায় থাকবে। প্রতি ঘণ্টায় সেগুলো ইন্সপেকশন করা হবে। নিয়মিত ফায়ার ড্রিল করা হবে। বাইরে থাকবে পানির সেফটি ট্যাংক। সহজে খুলে সেখান থেকে আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে। ফায়ার ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে অটোমেটিক অ্যালার্ম সংযুক্ত থাকবে। আগুন লাগার মুহূর্তেই তারা খবর পেয়ে যাবে। গাড়ি নিয়ে চলে আসবে। সবাইকে মরার আগেই বাঁচাবে। থাকবে কর্মরত শ্রমিকদের ইন্সুরেন্স। কেউ আহত-নিহত হলে তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেবে এই ইন্সুরেন্স কোম্পানি।
এইগুলো নিশ্চিত না করে সরকার তুমি একজন মালিককে গারমেন্টস ইন্ডাস্ট্রি করার অনুমতি দাও কেন? যখন দিচ্ছ তখন লোকগুলোর এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য দায়-দায়িত্ব তোমার উপরেই পড়বে সরকার।
তুমি নাগরিকের সকলপ্রকার দায়-দায়িত্ব নিয়েছ বলেই তুমি সরকার হয়েছ। এটা তো ঢেঁকুর তোলার জন্য জনগণ তোমাকে উপহার দেয়নি! জনগণ যাতে ঢেঁকুর তুলতে পারে সে ব্যবস্থা তুমি নিশ্চিত করবে এই শপথ নিয়েই তুমি সরকার হয়েছো। একজন নাগরিক লঞ্চে ডুবে মরল কেনো—তার দায় তোমার। তুমি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঠেকানোর কী করেছ? কয়জন দায়ী মালিককে সাজা দিয়েছ? সেটা যদি করতে তাহলে দুর্ঘটনা ঘটত বছর বছর? সাগর রুনীর বেডরুমে খুনিরা ঢোকার সাহস পেলো কোথায়? তুমি যদি লক্ষ্মীপুরের খুনি বিপ্লবের সাজা মওকুফ না করতে তাহলে কী হত্যাকারীরা বেডরুমে ঢোকার সাহস পেত? নাগরিকের বেডরুমে পাহারা দেওয়ার দায়িত্বও তোমার হে সরকার। প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তোমার বলেই সংবিধান করেছ। এটা অস্বীকার করলে তো তুমি আর সরকার থাকো না।
এবং বাবা রাজনীতিক, বাবা ডাইনা পার্টি আর বামা পার্টি, তোমাগো কাম কি? তোমারা আছো কেন? ক্ষোভ প্রকাশের জন্য? বিবৃতি দিয়ে নাম জাহির করার জন্য? মিটিং মিছিল করে লম্বা-চওড়া ছবি দেখানোর জন্য? ক্ষমতায় যাওনের লাইন করার জন্য? তোমরা এইগুলো কর আমার আপত্তি নাই। কিন্তু তুমি কেনো নাগরিকের অধিকারগুলো আদায় নিশ্চিত না করে আরেকটা ইস্যু খুঁজছো? সরকার নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন করবে, আইন প্রইয়োগকারী সংস্থাকে দিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে, আইন মানতে সবাইকে বাধ্য করবে—এগুলো নিশ্চিত না করে সরকারকে তুমি ওয়াক-ওভার দিচ্ছ কেন? বাবা রাজনীতিক, তুমি বুকে হাত দিয়ে বল তো—তুমি নাগরিকের অধিকার আদায়ে ধারাবাহিকভাবে কিছু করেছ আজ পর্যন্ত ? কোনো কিছুর শেষ দেখে ছেড়েছো? আসলে সরকারের সঙ্গে তুমিও সমানভাবে জনগণকে ধোঁকা দিচ্ছ। এগুলো যদি না পারো—তাহলে তুমি রাজনীতিতে কেনো আসছ বাবা রাজনীতিক?
মানবাধিকার সংস্থাগুলো, তোমরা কয়টা ঘটনার মনিটরিং বজায় রেখেছ? কয়টার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি বিধানে মামলা করেছ? বা করার ব্যবস্থা নিয়েছ? এনজিওগণ শুধু সুদ-আসলের কিস্তি আদায় করা ছাড়া নাগরিকের জন্য কী করছ? এবং গডো ইউনূস, আপনার শান্তি শুধু আপনার একার গলার মেডেল আকারে ঝোলে কেনো? আপনি কেনো নিজের অধিকার ছাড়া কথা কন না? আপনি কেনো আওয়াজ দেন না— আশুলিয়ায় আগুনে পুড়ে মানুষ মরল কেনো? কেনো সাভারে মরবে না তার ব্যবস্থার দাবি তোলেন না?
এইবার আসেন, ব্রাদার কবি, একটা না, বেশ কয়েকটা কবিতা লেখেন। পড়ে আমরা ঘরে বসে উত্তেজিত হই। একটু পান করি। তারপর ফেসবুকে বুক রেখে একটা স্টাটাস দেই–আহারে, আগুন, তুমি খুউব খারাপ। তোমাকে নেভাতে পারে এমন কোমল জোড়া-ঠোঁট কোথায়?
লেখক: ব্লগার ও গবেষক
মুক্তমঞ্চে প্রকাশিত লেখা/মতামতের দৃষ্টিভঙ্গী সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব; এর সাথে উন্মোচনডটকমের দৃষ্টিভঙ্গী বা নীতিমালার মিল না-ও থাকতে পারে। মুক্তমঞ্চে লেখার ঠিকানা: muktomoncho.unmochon@gmail.com



