Sunday, Dec 9th, 2012 at 11:08pm BdST
প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ

বিশ্বজিৎ… ভুল সময়ে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলে

বিশ্বজিৎ… ভুল সময়ে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলে

রাসেল পারভেজ

বিশ্বজিৎ কোনো ন্যায় যুদ্ধে যায় নি, বিশ্বজিৎ কোনো অন্যায় যুদ্ধে যায় নি, বিশ্বজিৎ শহীদ হবে না, বিশ্বজিৎ বেহেশতে যাবে না, বিশ্বজিৎ শুধু ভুল সময়ে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো।

তার মৃত্যুতে কোনো শোক দিবস ঘোষিত হবে না, তার লাশ নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই আর অরাজনৈতিক প্রচারণায় এখন বিশ্বজিতের কিছুই যায় আসে না। বিশ্বজিতের পোস্টমর্টেম হবে, জানা যাবে আদৌ ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয়েছে তার না কি কেউ আগেই বিষ গিলিয়ে মেরে ফেলেছিলো তাকে। মৃত লাশটা রাস্তায় হাঁটতে দেখে ভয়ার্ত ছাত্রলীগের কর্মীরা ভ্যাম্পায়ার সন্দেহ করে রসুন ছুড়ির বাঁটে লাগিয়ে হয়তো ড্রাকুলানিধন করেছে তাকে।

আমি আনন্দিত বিশ্বজিৎ অন্তত ধর্মনিরপেক্ষ আঘাতে মৃত্যুবরণ করলো, তাকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বলি হতে হলো না। নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রেখে এভাবে মরে যাওয়ার সৌভাগ্য সকলের হয় না। অবশ্য এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। গত কয়েক বছরে ছাত্রলীগের ভেতরে এত এত শিবির কর্মী লুকিয়ে ঢুকে গিয়ে ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন করছে, তাতে এই ৫ জন সংক্ষুব্ধ যুবক শিবিরকর্মীও হতে পারে।

বিশ্বজিতের মৃত্যু আসলে একেবারে বিফলে গেলো, এই দু’দিন সংবাদপত্রে তার আত্মীয় স্বজনের ছবি আসবে, হাহাকার তো ছবিতে উঠে আসে না, কান্নার শব্দ বাক্যে প্রকাশ পায় না। বিশ্বজিতের মতো মানুষগুলো জনসংখ্যা শুমারীতে নিছক একটা অঙ্ক হিসেবে বেঁচে থাকে আর এমন রাজনৈতিক অপমৃত্যুতেও শুধু মৃতের ঘরে একটা বাড়তি টালির দাগ হয়ে মিলিয়ে যায়।

তার হত্যার বিচার কি হবে বাংলাদেশে? এভাবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার বিচার কি বাংলাদেশে হয়েছে আগে কখনও?

মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড বলা যাবে না এই হত্যাকে, মানবতার ঝাণ্ডা একাই তুলে ধরে রেখেছে এই ধর্মনিরপেক্ষ ছাত্রলীগ। তাহলে বিশ্বজিতের জন্যে আসলে কোন বিশেষণ আমাদের ভাঁড়ারে আছে?

বিশ্বজিতের তো বড়াই করে বলবার মতো কোনো পরিচয় ছিলো না, বাবা মিষ্টির দোকানের কর্মচারী ছিলেন, বিশ্বজিৎ ছিলেন সেলাই কারিগর, শাখারিবাজারে তার একটা টেইলার্সের দোকান ছিলো। যখন এই অবরোধের ভেতরে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তখন তার মাথার ভেতরে শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ-বিএনপি কোনো ভাবনাই ছিলো না। বাংলাদেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মতো হয়তো প্রতি বছর ভোটের সিজনেই তার ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দোলা লাগতো, কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপি এভাবেই ভোট দিয়ে নিজের সামান্য নাগরিক দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। হয়তো স্লোগান আর ধাওয়ার ভেতরে দোকানের সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে তিনি ভাবছিলেন এ সঙ্কটও কেটে যাবে, মিছিলটা শেষ হলে তিনি দোকানটা খুলবেন, তারপর হাতের কাজ উঠিয়ে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিবেন। তিনি চিরবিশ্রামে চলে গেলেন, তার না সেলাই করা কাপড়গুলো দোকানে সাজিয়ে। তার দুর্ভাগ্য তিনি সেলাই ম্যাশিনটা চালাতে পারলেন না, পোশাকের লিখে রাখা মাপ মেপে দাগ কেটে কাপড়টা কাটলেন না। তবে সেলাই কাঁটাছেড়া থেমে নেই, আজ তার লাশ কাঁটা ছেড়া করে সেলাই করছে মর্গের ডাক্তার।

বিশ্বজিৎ দুঃখিত তোমার মৃত্যু নিছক একটা মৃত্যু, একটা ব্যর্থ মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে তুমি আজকে সকালে যখন নিজের দোকান খুলতে এসেছিলে, তখন কি এমনটা ভেবেছিলে যে এভাবে নিছক একটা সংখ্যায় অবসান হবে তোমার জীবনযাত্রা। দৌড়ে পালানোর উপায় থাকে না আসলে দুঃস্বপ্নের মতো উদ্যত ছুরি হাতে তাড়া করা লোকজনের ভেতরে তুমি কোন দিকে যাবে?

তোমার মৃত্যু আসলে গুরুত্বহীন, দেখো মৃত্যুর ১২ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও এখনও তোমার লাশের কোনো দাম ঘোষণা করলো না কেউই, তোমার লাশ রাজনীতির মঞ্চে নিলাম হলো না।

দরাজদিল প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়তে হলে তোমাকে পুড়ে মরতে হতো, তুমি পুড়ে মরলেই প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা পেতো তোমার পরিবার। তোমার মৃত্যু একেবারে বিফলে গেলো, তোমার শোকগ্রস্ত পরিবারের শোক ভোলার জন্যে কোনো পারিশ্রমিক ঘোষণা করেননি মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী। তোমার ব্যর্থ মৃত্যু এখনও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নি।

লেখক: ব্লগার ও শিক্ষক

মুক্তমঞ্চে প্রকাশিত লেখা/মতামতের দৃষ্টিভঙ্গী সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব; এর সাথে উন্মোচনডটকমের দৃষ্টিভঙ্গী বা নীতিমালার মিল না-ও থাকতে পারে। মুক্তমঞ্চে লেখার ঠিকানা: muktomoncho.unmochon@gmail.com

ফেসবুক মন্তব্য

টি মন্তব্য

Place Your Advertisement Here!
Close