Tuesday, Jan 22nd, 2013 at 12:09pm BdST
প্রচ্ছদ » বিশ্লেষণ

উপনিবেশ স্থাপনের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আল-কায়েদা

উপনিবেশ স্থাপনের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আল-কায়েদা

 

এক সপ্তাহ আগে মালিতে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের দমন করতে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করেছে ফ্রান্স। এই অভিযানে অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিও নানাভাবে সহযোগীতা করছে। দেশটিতে ফ্রান্সের এই অভিযানের কারণ হিসেবে ইসলামপন্থী জঙ্গি ও আল-কায়দা নির্মূলের কথা বলা হলেও, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সাংবাদিক নেইল ক্লার্কের মতে এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ। রাশিয়া ভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আরটি’কে দেয়া এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতকারে মালিতে ফ্রান্সের সামরিক হস্তক্ষেপ ও তাতে পশ্চিমা অন্যান্য শক্তির আগ্রহের বিষয়ে বেশ খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। তার মতে, উত্তর আফ্রিকায় নতুন করে উপনিবেশ স্থাপনের স্বার্থেই আল-কায়েদা জুজুকে ব্যবহার করছে পশ্চিমা বিশ্ব। সাক্ষাতকারটি অনুবাদ করেছেন তৌহিদুল ইসলাম।

 

আরটি: মালিতে ফরাসী সামরিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাজ্য সহযোগীতা করছে, আলজেরিয়ায় কথিত জঙ্গিদের হাতে বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে ব্রিটেনের জনগণ ও রাজনীতিবিদরা কতটুকু শঙ্কিত বলে আপনি মনে করেন?

নেইল ক্লার্ক: আমার মনে হয় এই বিষয় নিয়ে তারা বেশ ভালোই শঙ্কার ভিতরে আছেন। কারণ ডেভিড ক্যামেরন গত বছর সিরিয়ায় ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, এখন আবার মালিতে ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের বিশ্বের জন্য বড় বিপদ হিসেবে তুলে ধরে সেখানে এমনভাবে নাক গলানোর চেষ্টা করছেন, যেন ব্রিটেনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও ফ্রান্সকে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেই হবে। আমার মতে, এটা খুবই ভ্রান্ত পরিকল্পনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো ব্রিটেনের রাজনৈতিক এলিটরা এই পরিকল্পনার পেছনে কাজ করছে, যা বেশ বিরক্তিকর, কিন্তু যা ঘটছে তা নিয়ে জনগণ বেশ শঙ্কিত বলেই আমার ধারণা।

আরটি: কিন্তু কী প্রাপ্তির আশায় মালি অভিযানে ফ্রান্সকে সাহায্য করার ব্যাপারে যু্ক্তরাজ্য এতটা আগ্রহ দেখাচ্ছে?

নেক্লা: বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং, দেখুন, ২০১১ সালে লিবিয়ায় কর্নেল গাদ্দাফিকে হটানোর ব্যাপারে ডেভিড ক্যামেরন, উইলিয়াম হাগ ছিলেন সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ লোকদের মধ্য অন্যতম। এখন আবার তারাই বলছেন যে মালিতে আল-কায়দাকে উচ্ছেদ অভিযানে আমাদের অংশ নিতেই হবে। এখানেই আসলে তারা সবচেয়ে বেশি প্রতারণাটা করছেন। কেন আফ্রিকায় আল-কায়দা হটানোটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ? আর এখানে ব্রিটেনের স্বার্থই বা কী? আমি মনে করি উত্তর আফ্রিকায় নতুন করে উপনিবেশ স্থাপনের ঢাল হিসেবেই আল-কায়দা জুজু ব্যবহার করা হচ্ছে, আর এটা করছে ন্যাটো বাহিনী, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্র।

আরটি: এই কারণেই কী তারা সিরিয়ায় আল-কায়দার উত্থানকে এড়িয়ে যাচ্ছে?

নেক্লা: নিঃসন্দেহে!  আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব থেকে বড় মিথ হলো যে, বিগত ২০-৩০ বছর ধরে পশ্চিমা শক্তি আল-কায়দার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। না, কোনভাবেই তারা তা করছে না। তারা যেটা করছে তা হলো আল-কায়দা জুজুকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি গাড়ছে, যেমন আফগানিস্তান। কিন্তু অন্যদিকে দেখুন, সেই আল-কায়দাকে কাজে লাগিয়েই লিবিয়া বা সিরিয়ার অপেক্ষাকৃত সেক্যুলার শাসনের পতন ঘটাচ্ছে তারা। এটা ফ্রাংকেনস্টাইনের সেই দানবের মতোই, যার সূচনা হয়েছিল আশির দশকে আফগানিস্তানে। সেখানে রেড আর্মির পতন ঘটাতে পশ্চিমা শক্তি আল-কায়দা ও ইসলামী জঙ্গিদের ব্যবহার করেছে। এটা তাদের পরিকল্পনারই অংশ।

আরটি: উত্তর আফ্রিকায় যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে, আর এর প্রতিক্রিয়াই বা কী হতে পারে?

নেক্লা: খুব তাড়াতাড়ি এর থেকে সরে আসার কোন সম্ভাবনা আমি দেখছি না। কারণ গত সপ্তাহেই ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন যে মালিতে ইসলামপন্থীদের কোনভাবেই ক্ষমতা নিতে দেয়া যাবে না। এই অবস্থান থেকে কয়েক দিনের মধ্যে তার ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। মালির পরিস্থিতিকে বেশ গুরুতরভাবেই হাজির করছেন ক্যামেরন। ফলে আমি বেশ ভয়ই পাচ্ছি, মনে হচ্ছে মালিতে আগ্রাসন চালানোর বিষয়ে যে কোনভাবেই হোক আমাদের হয়তো সমর্থন আদায় করে নেয়া হবে।

আরটি: আফ্রিকায় প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। এখানে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে কোন কোন দেশ সবচেয়ে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে?

নেক্লা: এক নম্বরেই আছে ফ্রান্স, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ওলাঁদের দৃষ্টিতে যদি দেখি, দেখা যাবে- ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট খারাপ, আর মালিতে একটা সফল অভিযান নিঃসন্দেহে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ওলাঁদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেবে। ইউরেনিয়াম ইস্যুতেই বিষয়টা বেশ পরিস্কার- ফ্রান্সের ইউরেনিয়াম দরকার, আর মালিতে প্রচুর ইউরেনিয়াম রয়েছে। ফলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সেখানে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। আর বিগত ৩০ বছরে প্রতিটি পশ্চিমা অভিযানের পেছনেই রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ। যুগোশ্লাভিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া সব আক্রমনের পেছনেই মানবিকতা, গণতন্ত্রের দোহাই থাকলেও সেগুলো ছিল মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে। পশ্চিমা শক্তিগুলো আসলে এইসব অঞ্চলের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। আমার ধারণা উত্তর আফ্রিকায় ঘাঁটি গাড়তে যাচ্ছে ন্যাটো। এটাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। আফগানিস্তান ছাড়ার পরে উত্তর আফ্রিকাই হবে ন্যাটোর পরবর্তী ঘাঁটি আর এজন্যই আল-কায়দা জুজুকে বড় করে দেখানো হচ্ছে।

 

উন্মোচনডটকম/টিআই/১১৫৮ ঘণ্টা, ২২ জানুয়ারি, ২০১৩

ফেসবুক মন্তব্য

টি মন্তব্য

Place Your Advertisement Here!
Close