Friday, Jan 25th, 2013 at 5:13pm BdST

ফারসীম মান্নানের বই ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ফারসীম মান্নানের বই ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই লিখছেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। তার লেখা ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই এবার একুশে বই মেলায় প্রকাশ করছে শুদ্ধস্বর প্রকাশনা সংস্থা। বইটি নিয়ে ড. বিমান নাথের ভূমিকাটি উন্মোচনডটকমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ড. বিমান নাথ•

জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে ইতিহাসের মধ্যে একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। তাদের মধ্যে যোগাযোগটা শুধু এই কারণে নয় যে জ্যোতির্বিদ্যা হল বিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরনো বিষয়; এই যোগটা শুধু একমুখী নয়। ইতিহাসে অনেক বার এমন কিছু সময় এসেছে যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা ইতিহাসের ধারাটাকেই পাল্টে দিয়েছে। চাষবাস শুরু করার পর যখন থেকে মানুষের জীবন স্থিতিশীল হল, মানব সভ্যতার সেই গোড়ার থেকেই তার নজরে পড়েছে আকাশের গ্রহ-নত্রের গতিবিধি। এর মারফতে সে ঋতুপরিবর্তনের রহস্য বুঝতে পেরেছে, এবং সময় গণনার কলাকৌশল আয়ত্ত করতে পেরেছে, যার জন্য তার কৃষিকাজ হয়েছে উন্নততর।

শুধু ইতিহাসের ধারা নয়, মাঝে মাঝে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা বিজ্ঞানের দর্শনকেও বদলে দিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের সূত্রপাতের পেছনে কোপার্নিবাস, গ্যালিলেও, কেপলারের পর্যবেক্ষণ অনেকাংশে কাজ করেছে। কেপলারের সূত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়েই নিউটনের হাতে জন্ম নিয়েছিল আধুনিক বলবিদ্যা। আর সেখানেই আধুনিক পদার্থবিদ্যার, এবং এক কথায় আধুনিক বিজ্ঞানের পথচলা শুরু।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে ইতিহাসের এই ওতোপ্রোত হয়ে থাকার বিষয় নিয়ে যদিও বাংলায় নানার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, বিষয়টির গুরুত্বের তুলনায় এমন বইয়ের সংখ্যা নগণ্য বলে মনে হয়। অথচ আকাশের তারার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মানবসভ্যতার এই চমকপ্রদ যোগাযোগটির কথা সাধারণ পাঠকের কাছে তুলে ধরার একটা বিশেষ প্রয়োজন আছে। আজকের যান্ত্রিক যুগে, যখন বিনোদনের নানান মাধ্যম রয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়, আর যখন শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার আলোর ঝলসানিতে রাতের আকাশের নত্রক্ষদের ইচ্ছে করলেও দেখা প্রায় অসম্ভব, এই সময়ে বিজ্ঞান, ইতিহাস আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের গূঢ় যোগসূত্রগুলো আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা যে সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বর্তমান যুগের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা খুব একটা পরিষ্কার বোঝা যায় না। অনেকের মনে হতে পারে এই পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী লাভ! বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে পেছন ফিরে তাকানোর কোনও দরকার আছে কি?

কিন্তু ইতিহাস চর্চা শুধু অতীত নয়, আমাদের বর্তমানকেও আলোকিত করে। এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে। যদিও আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিবিদ্যার অনেকটাই আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলার চেষ্টায় ধাবিত, কিন্তু বিজ্ঞানের যেসব বিষয়ে আমাদের পৃথিবী, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে গবেষণা হয়, সেই সব বিষযে আজও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সুক্ষ্মতিসূক্ষ্ম পদার্থকণার গবেষণার সঙ্গে মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষণ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমরা জানি যে, কার্বনের যে রূপ নিয়ে আজকাল প্রচুর গবেষণা হচ্ছে, সেই সি-৬০-র অস্তিত্বের প্রথম চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল মহাকাশের ধুলোর গবেষণার সময়।

তাই বিজ্ঞানের এবং আমাদের সভ্যতার যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সম্পর্ক এখনও অটুট। সেই জন্য প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাহিনী মনে রাখার এবং তাঁদের অবদানের কথা আলোচনা করারও প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় নি। বিশেষ করে যখন নতুন গবেষণা অনেক নতুন তথ্য আবিষ্কার করছে। এর ফলে আমাদের ঐতিহ্য সম্বন্ধে আমাদের ধারণাও পাল্টাচ্ছে। সেই জন্য বাংলা বইয়ের জগতে এই নিয়ে লেখা বইয়ের অভাব বিশেষ করে বোধ হয়। এই সব বিষয়ের আলোচনা শুধু বিজ্ঞানী আর ইতিহাসবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, কারণ ইতিহাসকেও সেইজন্য মনোগ্রাহী করে তোলা চাই। এর জন্য এমন লেখক চাই যাঁর সম্বল শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, যাঁর লেখার মধ্যে ইতিহাসের রোমাঞ্চটাও ফুটে উঠবে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের চমকপ্রদ প্রসঙ্গগুলো ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধে উজ্জ্ব্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। প্রাচীন গ্রীস, ব্যাবিলন থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানান প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। প্রতিটি বিষয় নিয়ে লেখকের আলোচনার গভীরতা এবং ব্যাপ্তি আমাদের ভাবনার খোরাক বাড়ায়। বইয়ের ছবিগুলি প্রবন্ধের পাঠকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রতিটি প্রবন্ধের শেষে তথ্যপঞ্জীও সমৃদ্ধ করেছে বইটিকে। আর লেখকের সহজ ভাষা আমাদের এই আপাত কঠিন বিষয়বস্তুর গভীরে টেনে নিয়ে যায়। বইয়ের শুরুতে আমরা পড়ি প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কথা: ‍আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের সময় থেকেই রাতের আকাশ তার সঙ্গী। একে সে উপেক্ষা করে কী করে? প্রাচীনকালের রাতগুলো ছিল রহস্যে ভরা, নিঃসঙ্গ আর অসহায়। রাতের বেলা সূর্যের অনুপস্থিতি প্রাচীন মানুষকে ভয়াতুর করে দিত। সেইসব আদিম রজনীতে বিন্দু বিন্দু আলোর উৎস সিঃসন্দেহে ছিল চিন্তার উৎস।” এমন করে খাবার পরিবেশন করলে কি কারোর খিদে না পেয়ে যায়?

লেখকের সাবলীল ভাষার দৌলতে প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আমাদের একটা ঘনিষ্ঠ পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়। লেখক এই বিষয়গুলোকে শুধু একজন বিজ্ঞানী বা ইতিহাসবিদের চোখ দিয়ে দেখেন নি। তাঁর কলমে ইতিহাসের সময়গুলো আমাদের সামনে শুধু পরিষ্কারভাবে নয়, অনেক কাছেও চলে এসেছে। তাঁর ভাষায়: ইউডক্সাসের গোলক” বলে কথিত গোলকটির উপর নামাঙ্কিত তারামণ্ডলীর পরিচিত ছবি দেখলে মনে হয় যেন ইউডক্সাস, কিংবা তাঁরও আগের কোনো পূর্বসূরী এবং আমি একসূত্রে গাঁথা পড়েছি।”

লেখকের এই ভাবনার রেশ তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধে ধরা পড়েছে। এই প্রবন্ধগুলো শুধু সুখপাঠ্য, বা তথ্যের আকর হিসেবে নয়, জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস চর্চার রোমাঞ্চকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। এর জন্য লেখকের এই প্রচেষ্টা আমাদের সকলের ধন্যবাদার্হ। আশা করি এই বই নিয়ে পাঠকসমাজে বিস্তারিত আলোচনা হবে, এবং তার পথ ধরে এমন আরও বই আমাদের চিন্তার নতুন খোরাক যোগাবে।

ফেসবুক মন্তব্য

টি মন্তব্য

Place Your Advertisement Here!
Close