মোমিন মেহেদী•
সাপ্তাহিক কাগজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জব্বার হোসেন আমার প্রিয় একজন লেখক; সেই সূত্র ধরে কাগজ-এর অফিসে গিয়েছিলাম দেখা করতে। সেখানে কথা বলতে বলতে চোখ বুলাচ্ছিলাম দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদের আইডল নাঈমুল ইসলাম সম্পাদিত আমাদের অর্থনীতিতে। হঠাৎ একটি শিরোনামে চোখ আটকে যায়, ‘আবিদ রহমান, দৈনিক আমাদের অর্থনীতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।’ মন দিয়ে পড়তে থাকি- ‘ সাংবাদিক আবিদ রহমান দৈনিক ‘আমাদের অর্থনীতি’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অভিজ্ঞ এই সাংবাদিকের পেশা শুরু সাপ্তাহিক রিপোর্টার ও অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ-এর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে। তিনি অধুনালুপ্ত দৈনিক জনপদ, দৈনিক আজাদ ও দৈনিক দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সহ-সম্পাদক, সিনিয়র রিপোর্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে টানা দশ বছর কাজ করেছেন। জনাব আবিদ বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক বিচিন্তা প্রকাশের পরিকল্পনা ও প্রাথমিক প্রকাশনার সঙ্গেও ছিলেন। তিনি ‘রাখাল’ নামের একটি আন্তর্জাল সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। তিনি ১৯৮৪ ও ১৯৮৬ সালে জাতীয় প্রেসকাবের নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে প্রবাসী আবিদ রহমান বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখে আসছেন। কবি ও সমালোচক আবিদ রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিনটি: প্রোপট’ ৭১ (সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প সংকলন, ১৯৭৯), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস (গবেষণা গ্রন্থ, ১৯৮২) এবং কুম্ভকর্ণ চারপাশ, ২০১১)।
১৯৮২ সালে জনপদ নাট্যদল আবিদের রচনা ও নির্দেশনায় মহিলা সমিতিতে মঞ্চস্থ করে ‘মেট্রোপলিশ’। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আবিদের রূপান্তরিত মলিয়ের ‘বউদের পাঠশালা’ দর্শকনন্দিত হয়। জনাব আবিদ প্রবাস জীবনেও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি মেলবোর্ন বাংলা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৭৯ সালে আলোচিত সংগঠন ‘রাখাল’র প্রকাশনা ‘স্বরূপ অন্নেষা’য় ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বিষয়ক গবেষণাধর্মী লেখার মাধ্যমে আবিদ সাহিত্যে নিজের আগমনী বার্তা দেন। দৈনিক দেশ-এ একটি কবিতা দিয়ে একজন কবিকে মূল্যায়নের কলাম ‘অকথিত কথা’ সেই খ্যাতিকে স্থায়িত্ব দেয়। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জনাব আবিদ চার বছর ব্যাংকিং ও দশ বছর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি শিপিং ও ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যবসায় বিশেষজ্ঞ। জনাব আবিদ হংকং, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেছেন। রাজনীতি সচেতন আবিদ রহমান অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতহীন আবিদ রহমান দৈনিক ‘আমাদের সময়ের নিয়মিত প্রদায়ক। তিনি বাংলানিউজ ২৪ ডটকমের কন্ট্রিবিউটিং এডিটরও। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত ও একমাত্র পুত্র সন্তানের জনক।’
সংবাদটি পড়া শেষ হলে জব্বার ভাইর সাথে এ বিষয়ে হালকা কথা হলেও পরে আবার আলাপ হয়- বরেণ্য একজন সাংবাদিকের সাথে। তিনি জানান, আবিদ ভাই প্রচণ্ড পরিশ্রমি। জীবনে নিবেদিত ছিলেন দেশ-মাটি ও মানুষের জন্য। যে কারণে নতুন নতুন পেশার সাথে পরিচিত হয়েছেন। যে কারণে কষ্টের কালোমেঘ সরাতে সচেষ্ট থেকেছেন সবসময়।
সেই পরিচয় জানার পর আমাদের সময়-এর একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে লেখা পাঠিয়ে ফোন দিয়েছিলাম। ফোন রিসিভ করেই বলেছিলেন, কে বলছেন?
জ্বি, মোমিন মেহেদী বলছি।
আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গড়গড়িয়ে বলেছিলেন আমার লেখার আদ্যপান্ত। আমিতো শুনে হতবাক। লেখা পাঠানোর মাত্র দু’ঘণ্টার মধ্যে তিনি ডাউনলোড করে পড়েছেনও!
এই মানুষটি যতদিন আমাদের অর্থনীতিতে ছিলেন, লেখা পাঠালে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন ভালোবেসে-স্নেহ করে। পরে একবার আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, মেহেদী, তোমার বয়স কম; লড়ে যাও। লড়তে লড়তে গড়তে পারবেই। যা আমরা পারিনি; তা তুমি- তোমার বন্ধুরা পারবে।
সেই যে উৎসাহ, সেই যে সাহসের বীজ তিনি বুনেছেন, সেই সাহসের হাত ধরে আমরা ‘নতুনধারা বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে লড়ে যাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে প্রিয় আবিদ ভাই চলে গেলেন মেলবোর্নে। যাওয়ার আগে আরেকবার কথা হলেও সময় সংক্ষেপ থাকায় আলাপ জমেনি। তিনি নিবেদিত মানুষদেরকে কাছে টেনে নিতেন। নিয়েছিলেন আমাকেও। কিন্তু তাও আর স্থায়ী হলো না। আমার অভিভাবক শূণ্যতার ধারাবাহিকতায় কবি শামসুর রাহমান, ভাষা সৈনিক মাহাবুব উল আলম চৌধুরী, গাজীউল হক, রাজনীতিক আবদুর রাজ্জাক, নির্মল সেন, সমুদ্র গুপ্ত প্রমুখের পথ ধরে চলে গেলেন আবিদ রহমানও। এই চলে যাওয়া এমন সময়, যে সময় নতুন প্রজন্ম জেগে উঠছে; সে সময় তাঁর চলে যাওয়া শুধু শোকাহতই করেনি; করেছে অভিভাক-পরামর্শকহারাও।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবিদ রহমান-এর জীবনময় আরাধনা ছিলো। ছিলো প্রচণ্ড প্রত্যয়।মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া আমাদেরকে করেছে নিঃশ্ব। তবে বাংলাদেশকে গড়তে তাঁর লড়ে যাওয়ার কথা মনে রেখে এগিয়ে যাবো। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে আরো জোরে আরো জোরে ছুটে যাবো বিদ্রোহের রাস্তায়। কেননা, তিনি শিখিয়েছেন লড়ে যেতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় তার লড়ে যাওয়ার কথা।
মৃত্যুর আগেও তিনি নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন দেশের জন্য-মানুষের জন্য। নিজ বাসায় শাহবাগের গণজাগরণ নিয়েই কথা বলছিলেন আবিদ রহমান। এ সময় হঠাৎ তিনি অসুস্থ বোধ করার কথা জানান। দ্রুতই তার হার্ট ফেইল করে। এ সময় প্যারামেডিক সেন্টারে খবর দেয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা আবিদ রহমানের নবেল পার্ক এলাকার বাড়িতে গিয়ে আধাঘণ্টারও বেশি চেষ্টা চালালেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে মেলবোর্নে আন্দোলন গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবিদ রহমান।
তাঁর নিবেদনের আরেকটি প্রমাণ এবারের বইমেলায় তাঁর বই। ‘চক্ষুমান অন্ধ’ নামের এই বইটিতে তিনি তুলে ধরেছেন রাজনীতি-অর্থনীতিসহ সকল অসামঞ্জস্য। যা আমাদের সমাজকে-দেশকে কষ্টের কারাগারে আবদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। তিনি ছিলেন চির তরুণদের দলে। সেই দলে থেকে তিনি শাহবাগের প্রজন্ম স্কয়ারের গণজাগরণ ফেসবুকে খুব লিখছিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে অসাধারণ সব বাক্য।
ভালোবাসা-সম্মান-স্নেহ জোর করে হয় না। তাঁর লেখা থেকে জেনেছি। তিনি নিজেকে করেছেন নিতান্তই কর্মী। কিন্তু তৈরি করেছেন অনেক কর্ম বীর। যাদের জীবনজুড়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। যেমন বেঁচে আছেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, মিনার মাহমুদ, ডা. মিলন প্রমুখ…
মোমিন মেহেদী: কলামিস্ট ও আহ্বায়ক, নতুনধারা বাংলাদেশ



